ফরমালিন কি ?
কিভাবে খাদ্যে ফরমালিন সনাক্ত করবেন এবং ফরমালিন মুক্ত করার ঘরোয়া উপায়।
ফরমালিন কথাটির সাথে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। আমাদের প্রত্যেকেরই ফরমালিন এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে ধারনা আছে। খাবারে ফরমালিন ব্যবহার মানব স্বাস্থকে খুব বড় ধরনোর ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। আবর এই ফরমালিন-ই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও বলেও বিবেচিত। বিশ্বজুড়ে ফরমালিন তৈরির প্রচলন শুরু হয়েছিল মূলত এর উপকারী বৈশিষ্ট্যের জন্য। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার উপযোগী পদার্থটিকে ক্ষতিকর উপায়ে ব্যবহার করছে। ফলে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জীবন বিপন্ন হতে যাচ্ছে। তাই আমাদের ফরমালিন এর সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জানতে হবে। পাশাপাশি জানতে হবে ফরমালিন যুক্ত খাবার চেনার উপায় ও তা থেকে কীভাবে মুক্তি পাওয়া যায়। এই আর্টিকেলটি পড়ার মাধ্যমে জানতে পারবেন খাবারে ফরমালিন এর প্রভাব ও এই সমস্যা সমাধানের উপায় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তাছাড়াও জানতে পারবেন ফরমালিন এর সঠিক ব্যবহার।ফরমালিন কী ?
মুখে মুখে আমরা ফরমালিন এর সাথে পরিচিত হলেও আসলে কিন্তু ফরমালিন সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারনা নেই। তাই আগে ফরমালিন সম্পর্কে জেনে নেয়া দরকার। ফরমালি মূলত কয়েকটি রাসায়নিক পদার্থের একটি সম্মিলিত যৌগ। ফরমালিন এর অন্তর্ভুক্ত উপাদান গুলো হলো ফরমালডিহাইড, পানি ও মিথানল। পানির সাথে ফরমালডিহাইড ও মিথাইলকে দ্রবীভূত করে ফরমালিন প্রস্তুত করা হয়। তবে এই দ্রবনে মিথানলের থেকে ফরমালডিহাইড এর পরিমান-ই বেশি থাকে। মোট দ্রবনের শতকরা ৪০ শতাংশ ফরমালডিহাইড থাকলে সেটা ফরমালিন বলে বিবেচিত হয়। এই রাসায়নিক উপাদানটি পচনশীল দ্রব্যে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করে। বেশি পরিমানে ফরমালিন প্রয়োগ করলে পচনশীল দ্রব্যের ব্যাকটেরিয়া পুরোপুরি ভাবে মরে যায়৷ ফলে ঐ দ্রব্যটিতে সহজে পচন ধরে না অর্থাৎ দীর্ঘদিন ভালো থাকে। তবে পচনশীল খাবারে প্রয়োগের জন্য এই রাসায়নিক উপাদানটি একদমই উপযুক্ত নয়। কিন্তু অতিরিক্ত লাভের জন্য কিছু লোভী ব্যবসায়ী খাবারেও ফরমালিন প্রয়োগ করছে। কেননা ফরমালিন প্রয়োগে পচনশীল খাদ্য অনেকদিন পর্যন্ত ভালো থাকে। ফলে অনেকদিন সংগ্রহ করে রাখা খাদ্যদ্রব্য বেশি মুনাফায় বিক্রি করতে পারে।
ফরমালিন এর সঠিক ব্যবহার ।
ফরমালিন বলতেই আমরা ক্ষতিকর একটি রাসায়নিক পদার্থকে বুঝে থাকি। কিন্তু ফরমালিন খাবারের সাথে আমাদের শরীরে প্রবেশ করলেই কেবল তা ক্ষতি করতে পারে। আপনি জানলে অবাক হবেন যে ফরমালিন এর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে। কেননা ফরমালিন পচনশীল দ্রব্যের ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করে কোনো জিনিস নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। তাই খাবার বাদে অন্যান্য যে সকল পচনশীল দ্রব্য রয়েছে তা সংরক্ষনের জন্য ফরমালিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী। মৃতদেহ সংরক্ষণ করতে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। মৃতদেহে খুব দ্রুত পচন ধরে, তাই সৎকারের আগ পর্যন্ত ফরমালিন ব্যবহার করে মৃতদেহের পচন রোধ করা যায়। বিশেষ করে দূর দূরান্ত থেকে লাশ আনা নেয়ার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিটি সবথেকে বেশি ব্যবহার করা হয়।জাদুঘরে মূল্যবান প্রাণীর মৃতদেহ সংরক্ষণ করে রাখা হয় এটা কমবেশি সবাই দেখেছি। আর এই কাজটি বেশিরভাগ সময়ই ফরমালিন এর সাহায্যে করা হয়। অতিরিক্ত মাত্রায় ফরমালিন প্রয়োগের ফলে মৃত প্রাণীদেহে কখনোই পচন ধরে না।
বস্ত্রশিল্পে ফরমালিন এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
কাপড়ের রং উজ্জল ও পাকাপোক্ত করতে রঙের সাথে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া যে কোনো পেইন্টিং এর ক্ষেত্রেই ফরমালিন ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে পেইটিং দীর্ঘদিন টেকসই হয়।তাছাড়া প্রসাধনী সামগ্রী, অটোমোবাইল, ইলেক্ট্রনিকস পণ্য তৈরিতে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে ফরমালিন এর বহুল ব্যবহার রয়েছে। এসব গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিশ্চিন্তে ফরমালিন ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজের পুঁজিপতি উৎপাদকেরা তাদের স্বার্থ হাসিল করতে খাদ্যদ্রব্যে উচ্চ মাত্রায় ফরমালিন ব্যবহার করে। যার ফল ভোগ করতে হয় সাধারণ মানুষদের। তবে খুবই সামান্য পরিমানে ফরমালিন ক্ষেত্র ভেদে কিছু কিছু খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহার করা যায়। এটা শুধুমাত্র দূরবর্তী এলাকা গুলোর মধ্যে বাজারজাত করার সুবিধার্থে। এর মাত্রা এমন হবে যাতে পণ্য বাজারে ওঠার সাথে সাথে এর কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। তবে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনা মোতাবেক এটি ব্যবহার করতে হবে আর ফরমালিন ব্যবহারের জন্য কোম্পানির লাইসেন্স থাকতে হবে। তবে অনুমোদিত মাত্রার থেকে সামান্য পরিমান-ও বেশি ফরমালিন পাওয়া গেলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৩’ নামক একটি আইনের খসরা তৈরি হয়েছে যেখানে ফরমালিন ব্যবহার ও এই কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সর্বনিন্ম ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হবে বলে জানা গেছে।
খাবারে ফরমালিন ব্যবহারের ভয়াবহতা ।
যে খাবার মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে সেই খাবার খেয়েই মানুষ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। কেননা ফরমালিন এক ধরনের ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থ যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে তা একটু হলেও মানব দেহের ক্ষতি সাধন করবে। মানুষের শরীরের প্রতি গ্রাম রক্তে শূন্য দশমিক ২ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত বিষ প্রবেশ করলে তা সহনীয় পর্যায়ে থাকে। কিন্তু ফরমালিন যুক্ত খাবার গ্রহনের ফলে এই বিষের মাত্রা কখনও কখনও ৯ দশমিক ৭ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে কিডনির সমস্যা, হৃদরোগ সহ মরণব্যাধি ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। খাবারে অতিরিক্ত মাত্রায় ফরমালিন থাকলে খাওয়ার সাথে সাথে পেটের পীড়া, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকলাঙ্গ হয়ে যাওয়া, শরীর দূর্বল হয়ে পড়া সহ নানান ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।
গর্ভবতী মায়েদের ফরমালিন যুক্ত খাবার সেবনের ফলে বিকলাঙ্গ সন্তান জন্ম দেয়ার ঝুঁকি থাকে। নিয়মিত ফরমালিন যুক্ত খাবার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে দেখা দেয় বিভিন্ন রোগের উপসর্গ। এছাড়া ডায়রিয়া, চর্মরোগ এগুলো তো নিত্য দিনের সমস্যা। তাই খাবারে ফরমালিন আছে কিনা সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে এবং ফরমালিন দূর করার জন্য যতোটা সম্ভব যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
খাবারে ফরমালিন আছে কিনা তা চিহ্নিত করার উপায় ।
পচনশীল খাদ্যদ্রব্য যেমন- মাছ, মাংস, ফল, শাকসবজি, দুধ, শুঁটকি সহ বিভিন্ন খাবারে অতিরিক্ত মাত্রায় ফরমালিন প্রয়োগ করা হয়। ফলে অনেক দিন ধরে এসব খাদ্য একদম টাটকা ও তরতাজা থাকে। দেখতে টকটকে হলেও এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জীবন ধ্বংসকারী বিষ। তাই ফরমালিন যুক্ত খাবার চিহ্নিত করতে পারা এখন সময়ের দাবি। তবে জেনেশুনে কখনোই ফরমালিন দেয়া খাদ্যদ্রব্য কেনা উচিত হবে না। ফরমালিন যুক্ত খাবার চেনার সবথেকে ভালো উপায় হলো খাবারের গন্ধ শোঁকা। যে কোনো খাবারে ফরমালিন যুক্ত করা হলে ঐ খাবারের নিজস্ব গন্ধ বা ঘ্রান কমে যায় কিংবা একদমই থাকে না। তার পরিবর্তে এক ধরনের ঝাঁঝালো গন্ধ পাওয়া যায়। ফরমালিন যুক্ত খাবার অনেক সময় ধরে ফ্রিজে না রাখলেও তা নষ্ট হয় না। এমনকি খাবার বিবর্ণ-ও হবে না। ফরমালিন যুক্ত খাবার সাধারণ খাবারের থেকে দেখতে বেশি চকচকে ও কালারফুল হবে। চামরা কুঁচকে থাকবে না৷ খাবারে কোনো পোকামাকড় ও মাছি পড়তে দেখা যাবে না। মিষ্টি জাতীয় খাবারে ফরমালিন দেয়া হলে তার মিষ্টতা কমে যায়। ফরমালিন যুক্ত মাছ মাংসে আঁশটে গন্ধ খুব কম পাওয়া যায়, অনেক সময় একদমই কোনো গন্ধা পাওয়া যায় না৷ সবথেকে ভালো হয় যদি ফরমালিন শনাক্তকরণ কিট ব্যবহার করে পরিক্ষা করতে পারেন। বাজারে এমন অনেক রাসায়নিক কিট পাওয়া যায়। কিট সংগ্রহ করার সময় বিক্রেতার কাছ থেকে ব্যবহার পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে নিতে হবে।
খাবারকে ফরমালিন মুক্ত করার উপায় ।
যদি মনে হয় আপনার সংগ্রহ করা যে কোনো খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন রয়েছে তাহলে ঘরোয়া কিছু উপায়ে ফরমালিনের মাত্রা অনেকটা কমিয়ে আনতে পারবেন। দু একটি পদ্ধতি আছে যার মাধ্যমে খাবারকে পুরোপুরি ফরমালিন মুক্ত করা যায়। জেনে নিন খাবারকে ফরমালিন মুক্ত করার ঘরোয়া উপায়।
১. সবথেকে সহজ ঘরোয়া উপাদান হলো পানি। যে কোনো শাক সবজি, ফল কিংবা মাছ-মাংস ১ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এতে থাকা ফরমালিন এর শতকরা ৬১ ভাগ কমে যায়। তাই মাছ বা মাংস বাড়িতে এনে কাটার আগে পানিতে ভিজিয়ে রাখুন৷ ফল খাওয়ার আগে পানিতে ভিজিয়ে পরে খান। এতে কিছুটা হলেও ফরমালিন এর ক্ষতি থেকে মুক্তি পাবেন।
২. লবন পানিতে যে কোনো খাবার ভিজিয়ে রাখলে খাবারের শতকরা ৯০ ভাগ ফরমালিন নষ্ট হয়ে যায়। তাই যে সকল খাবার লবন পানিতে ভিজিয়ে রাখা সম্ভব তা ১ ঘন্টা লবন পানিতে ভিজিয়ে রাখুন৷
৩. চাল ধোয়া পানি খাবারের ফরমালিন দূর করতে বেশ কার্যকরী। মাছ, মাংস অথবা শাকসবজি কাটার আগে ১ ঘন্টা চাল ধোয়া পানিতে ভিজিয়ে রাখতে পারেন৷ এতে করে খাবারে থাকা শতকরা ৭০-৮০ ভাগ ফরমালিন দূর হয়ে যায়। ফলে খাবার তুলনামূলক অনেক নিরাপদ হয়।
৪. খাবারের ফরমালিন দূর করার সবথেকে কার্যকরী উপাদান হলো ভিনেগার বা সিরকা। ১ কাপ ভিনেগার এর সাথে কয়েক চামচ পানি মিশিয়ে তাতে ফল, সবজি কিংবা মাছ-মাংস ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখলে শতকরা ৯৯.৯৯ ভাগ ফরমালিন নষ্ট হয়ে যাবে। বলা যায় পুরোপুরি ভাবেই ফরমালিন দূর করা যায়। তাই হাতের কাছে ভিনেগার থাকলে অবশ্যই এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করবেন।
৫. শুঁটকি মাছের ফরমালিন দূর করতে ১ ঘন্টা গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। তারপর প্রচুর পরিমানে নরমাল পানি দিয়ে ধুয়ে উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না করতে হবে।
মনে রাখবেন, ফরমালিন এমন এক ধরনের বিষ যা তাৎক্ষণিক ভাবে কোনো মারাত্মক ক্ষতি করে না। এটি একটি নীরব ঘাতক যা ধীরে ধীরে শরীরকে ধ্বংস করে দেয়। তাই ফরমালিন যুক্ত খাবার থেকে সব সময়ের জন্য সাবধান থাকতে হবে।