বিশ্বের ১৫টি দেশের ইফতার | Bangla Iftar Recipe 2025

ইফতার: মুসলিম বিশ্বের ১৫টি দেশের খাবারের ঐতিহ্য

Bangla Iftar Recipe

রমজান মাসে সারা বিশ্বের মুসলিমরা দীর্ঘ একদিনের উপবাস পালন করেন এবং সূর্যাস্তের পর ইফতার (রোজা ভাঙার সময়) করেন। প্রতিটি দেশের ইফতার খাবারের ধরন তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, জলবায়ু, এবং পুষ্টির চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন হয়ে থাকে। এখানে ১৫টি মুসলিম দেশের ইফতার খাবারের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো, যা তাদের প্রিয় উপাদান এবং খাবারের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে।


১. সৌদি আরব

প্রধান উপাদান: খেজুর, জাম্বো, ফ্রুট স্যালাড, মাটন স্যুপ, কাবসা, স্যাম্বুসা

  • খেতে কেমন: সৌদি আরবে ইফতার সাধারণত খেজুর দিয়ে শুরু হয়, যা শরীরে দ্রুত শক্তি প্রদান করে। এরপর খাওয়া হয় জাম্বো (মিষ্টি পুডিং), ফলের স্যালাড, এবং মাটন স্যুপ। তাদের প্রধান খাবার হলো কাবসা, যা মাংস ও মশলার সাথে রান্না করা ভাত। স্যাম্বুসা (ফ্রাইড পকোড়া) একটি গুরুত্বপূর্ণ স্ন্যাকস যা মাংস, সবজি, অথবা পনির দিয়ে ভরা হয়। ইফতার শেষে শরবত বা সাদা চা পান করা হয়।

২. তুরস্ক

প্রধান উপাদান: বোজে (ফল ও শস্যের স্যুপ), পিরাজ (পেঁয়াজ ও মাংসের মিষ্টি পকোড়া), কাবাব, ডিম

  • খেতে কেমন: তুরস্কের ইফতার শুরু হয় বোজে নামক একটি স্যুপ দিয়ে, যা বিভিন্ন শস্য, ফল এবং মাংস দিয়ে তৈরি হয়। এরপর খাওয়া হয় পিরাজ, যা মাংস ও পেঁয়াজ দিয়ে তৈরি মিষ্টি পকোড়া। কাবাব এবং ডিম (প্রায়শই দুধ দিয়ে রান্না) তাদের ইফতারে থাকে। তুরস্কের খাবারে প্রচুর মসলার ব্যবহার থাকে, যা সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

৩. ইন্দোনেশিয়া

প্রধান উপাদান: তাম্বুল (ভেজিটেবল রাইস), স্যাম্বাল, তাম্বুর (সামুদ্রিক খাবার), সেবু (শীতল ফলমূল পানীয়)

  • খেতে কেমন: ইন্দোনেশিয়া ইফতার শুরু হয় তাম্বুল (ভেজিটেবল রাইস) দিয়ে, যা মিষ্টি এবং মসলাদার হয়ে থাকে। স্যাম্বাল (এক ধরনের মশলা) তাদের খাবারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইফতারের পরে, সেবু নামে একটি ফলের পানীয় খাওয়া হয়, যা শরীরকে ঠান্ডা রাখে। তাম্বুর (মাছ ও শেলফিশ) তাদের সীফুড খাবারের মধ্যে অন্যতম।

৪. মিশর

প্রধান উপাদান: কাশরি (ভাত, মসুর ডাল, ফ্রাইড পেঁয়াজ, মসলাযুক্ত সস), ইয়ারিশ (স্মোকড মাংস)

  • খেতে কেমন: মিশরের জনপ্রিয় খাবার কাশরি, যা ভাত, মসুর ডাল, ফ্রাইড পেঁয়াজ এবং একটি মসলাযুক্ত সস দিয়ে তৈরি। এটি একটি পুষ্টিকর এবং শক্তিশালী খাবার। ইফতারের পরে ইয়ারিশ (স্মোকড মাংস) বা মিশরের ঐতিহ্যবাহী কিছু মিষ্টি যেমন বাকলাওয়া বা কিনেফা পরিবেশন করা হয়।

৫. পাকিস্তান

প্রধান উপাদান: শর্মা, চানা চাট, ফালুডা, পনির, মাটন রোস্ট

  • খেতে কেমন: পাকিস্তানে ইফতার খাবারে প্রচুর স্ন্যাকস এবং মিষ্টি পাওয়া যায়। শর্মা (মাংস ও সস দিয়ে তৈরি রোল), চানা চাট (ছোলা ও মসলাযুক্ত সালাদ), এবং ফালুডা (শীতল পানীয় ও স্ন্যাকস) জনপ্রিয়। এছাড়া পনিরমাটন রোস্ট ইফতারের প্রধান খাবার হিসেবে খাওয়া হয়।

৬. বাংলাদেশ

প্রধান উপাদান: খেজুর, চিড়া, দই, সেমাই, জিলাপি, স্যাম্বুসা, ফিরনি

  • খেতে কেমন: বাংলাদেশের ইফতার বেশ মিষ্টি ও সুস্বাদু হয়। ইফতার শুরু হয় খেজুর দিয়ে, এরপর খাওয়া হয় চিড়া, দই, সেমাই, জিলাপি, স্যাম্বুসা এবং ফিরনি। এসব খাবার মিষ্টি ও স্ন্যাকস হিসেবে খাওয়ার জন্য জনপ্রিয়। বাংলাদেশের ইফতার খাবারে মিষ্টি ও স্যাভরি খাবারের একটা সুন্দর মিশ্রণ থাকে।

৭. আলজিরিয়া

প্রধান উপাদান: হারিরা (মাংস ও শস্যের স্যুপ), বোরেক (ফ্রাইড পেস্ট্রি), খেজুর, ফল

  • খেতে কেমন: আলজিরিয়াতে হারিরা স্যুপ দিয়ে ইফতার শুরু হয়, যা মাংস, শস্য, এবং মসলা দিয়ে তৈরি। এরপর খাওয়া হয় বোরেক, যা মাংস বা সবজি দিয়ে তৈরি একটি পেস্ট্রি। ইফতার শেষে খেজুরফল খাওয়া হয়, যা শরীরকে শক্তি দেয়।

৮. কুয়েত

প্রধান উপাদান: মাটন বিরিয়ানি, স্যাম্বুসা, তাতার (মাছের কাবাব)

  • খেতে কেমন: কুয়েতে ইফতার সাধারণত মাটন বিরিয়ানি দিয়ে শুরু হয়, যা মাংস ও মশলা দিয়ে রান্না করা হয়। এরপর খাওয়া হয় স্যাম্বুসা এবং তাতার (মাছের কাবাব)। কুয়েতের খাবারে মসলার ব্যবহার অনেক বেশি, যা খাবারকে সুস্বাদু ও তিক্ত করে তোলে।

৯. ইরান

প্রধান উপাদান: কাশক, কাবাব, খোরেশ (মাংস ও ভাতের মিশ্রণ)

  • খেতে কেমন: ইরানে ইফতার শুরু হয় কাশক (এক ধরনের দই), এরপর কাবাব এবং খোরেশ (মাংস ও ভাতের মিশ্রণ) খাওয়া হয়। তাদের খাবারে বিভিন্ন ধরনের মশলা ও প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা খাবারকে সুস্বাদু এবং পরিপূর্ণ করে তোলে।

১০. আধুনিক আরব দেশগুলো (যেমন, সংযুক্ত আরব আমিরাত)

প্রধান উপাদান: তাববুলে, হুম্মুস, ফালাফেল, মাশরুম স্যুপ

  • খেতে কেমন: সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাববুলে (ধনে পাতা, চালে, এবং মসলা দিয়ে তৈরি একটি সালাদ), হুম্মুস (চিকপিস পেস্ট), ফালাফেল (তেলেভাজা মাংস) এবং মাশরুম স্যুপ খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। তাদের খাবারে স্বাস্থ্যকর এবং প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহৃত হয়।

১১. মালয়েশিয়া

প্রধান উপাদান: কুয়াহ, নাসি লেমাক, তেম্পে, রক্ত পিলাও

  • খেতে কেমন: মালয়েশিয়ায় ইফতার প্রথা অনেক বৈচিত্র্যময়। নাসি লেমাক হলো তাদের প্রধান খাবার, যা কোকোনাট মিল্ক দিয়ে রান্না করা ভাত, মাংস (চিকেন বা মাংস), ডিম, এবং বিভিন্ন শাকসবজি দিয়ে পরিবেশন করা হয়। এছাড়া কুয়াহ (সবজি ও মাংসের স্যুপ), তেম্পে (ফার্মেন্টেড সয়া), এবং রক্ত পিলাও (মিষ্টি মাংসের পিলাও) ইফতার টেবিলে থাকে। খাবারে মসলার ব্যবহার তাদের খাবারকে সুস্বাদু এবং চটপটে করে তোলে।

১২. লিবিয়া

প্রধান উপাদান: বাস্তা (পাস্তা), হারিরা স্যুপ, খেজুর, সেমাই

  • খেতে কেমন: লিবিয়াতে ইফতার শুরু হয় হারিরা স্যুপ দিয়ে, যা মাংস, শস্য এবং মসলা দিয়ে তৈরি। এই স্যুপটি খুবই পুষ্টিকর এবং সহজেই হজমযোগ্য। এরপর বাস্তা (পাস্তা) খাওয়া হয়, যা সাধারণত তেল, মাংস, শাকসবজি, এবং মসলা দিয়ে তৈরি হয়। তাদের মিষ্টি খাবারের মধ্যে সেমাই (বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি সেমাই) এবং খেজুর রয়েছে। খাবারের মধ্যে ভাজা এবং মিষ্টি উপাদানগুলোর মিশ্রণ ইফতারকে সুস্বাদু করে তোলে।

১৩. জর্ডান

প্রধান উপাদান: মাজদারা (ডাল ও চাল), মাটন স্যুপ, হুমুস, ফালাফেল, ফলের পানীয়

  • খেতে কেমন: জর্ডানে মাজদারা (ডাল ও চালের মিশ্রণ) তাদের জনপ্রিয় ইফতার খাবার। এরপর মাটন স্যুপ, হুমুস (চিকপিসের পেস্ট), এবং ফালাফেল (তেলেভাজা মাংস) খাওয়া হয়। জর্ডানের ইফতার বেশ স্বাস্থ্যকর এবং প্রচুর মসলার ব্যবহার থাকে, যা খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া, ফলের পানীয় এবং তাজা ফলের ব্যবহার খুবই সাধারণ।

১৪. মরক্কো

প্রধান উপাদান: হারিরা স্যুপ, তাজিন, ভেজিটেবল কুসকুস, খেজুর

  • খেতে কেমন: মরক্কোতে ইফতার শুরু হয় হারিরা স্যুপ দিয়ে, যা মাংস, শস্য, এবং মসলার সমন্বয়ে তৈরি। এরপর তাজিন (মাংস ও শাকসবজি দিয়ে তৈরি একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার), ভেজিটেবল কুসকুস, এবং খেজুর খাওয়া হয়। মরক্কোর খাবারে মসলার ব্যবহার থাকে খুবই ভারসাম্যপূর্ণ, যা খাবারকে স্বাদ এবং পুষ্টি দেয়।

১৫. কাতার

প্রধান উপাদান: খোরেশ, মাখবুস, ভাত, স্যাম্বুসা, ফলের পানীয়

  • খেতে কেমন: কাতারের ইফতার খাবারে খোরেশ (মাংস ও শাকসবজি দিয়ে রান্না করা ভাতের মিশ্রণ), মাখবুস (মসলাযুক্ত ভাত), এবং স্যাম্বুসা (মাংস, সবজি বা পনির দিয়ে ভরা পকোড়া) অন্তর্ভুক্ত থাকে। খাবারের মধ্যে মসলার তীব্র ব্যবহার এবং মিষ্টি খাবারেরও প্রাধান্য রয়েছে। এছাড়া, ফলের পানীয় শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।

ইফতার বিশ্বের নানা দেশেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য, এবং এর মাধ্যমে রোজাদাররা দীর্ঘদিনের উপবাসের পর শরীরকে শক্তি প্রদান করতে পারে। বিভিন্ন দেশের খাবারের ধরন একে অপরের থেকে অনেকটাই আলাদা, তবে প্রত্যেকটি খাবারে রয়েছে প্রচুর পুষ্টি এবং শরীরের জন্য উপকারী উপাদান। এসব খাবারের মাধ্যমে রোজাদাররা তাদের শরীরকে শক্তিশালী এবং সুস্থ রাখতে সক্ষম হয়। বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত মশলা, ফল, শস্য, মাংস এবং ভেজিটেবল উপাদানগুলোই তাদের খাবারের বৈশিষ্ট্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে।

Chef Jahed

https://web.facebook.com/ChefJahed.bd

Post a Comment

Previous Post Next Post