মেয়েরা কেন শেফ পেশায় আসবেন?
বর্তমানে, বিশ্বের বিভিন্ন কোণায় রান্নার পেশায় মেয়েদের অবদান এক অসাধারণ ইতিহাস তৈরি করেছে। শত শত বছরের পরিশ্রম, একাগ্রতা এবং রান্নার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আবেগের মাধ্যমে তারা আজকের এই উচ্চতায় পৌঁছেছেন। কিন্তু আমাদের দেশে, বিশেষত রান্নার পেশায়, মেয়েরা এখনও অনেকটা পিছিয়ে। যদিও, দিন দিন সেই বাধা ভাঙার প্রক্রিয়া চলছে এবং অনেক মেয়ে আজকে দেশের বাইরে আন্তর্জাতিকভাবে নিজের পরিচিতি গড়তে সক্ষম হচ্ছেন।রান্নার প্রতি মেয়েদের আকর্ষণ:
শেফ পেশায় মেয়েদের আগমন নতুন নয়। সমাজে রান্নার কাজ প্রায় শত শত বছর ধরে মহিলাদের দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু রান্নার প্রতি তাদের আগ্রহ এবং দক্ষতা কোনোদিন কম ছিল না। প্রতিদিন ঘরে খাবার তৈরি করতে গিয়ে অনেক অসাধারণ পদ তৈরি করেছেন আমাদের মা-বোনেরা, কিন্তু তাদের সেসব সৃষ্টি আজ কোথাও রেকর্ড করা হয়নি। সঠিক যোগাযোগ এবং শিক্ষা না থাকার কারণে তাদের রান্নার দক্ষতা মাপা যায়নি। তবে, ধীরে ধীরে সমাজের চিন্তা ভাবনা পরিবর্তিত হচ্ছে এবং মেয়েরা নিজেদের দক্ষতা এবং সৃষ্টিশীলতা নিয়ে এগিয়ে আসছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কালিনারি শিক্ষা গ্রহণকারী মেয়েদের সংখ্যা পুরুষদের থেকে অনেক বেশি। এমনকি পৃথিবীর সেরা কালিনারি ইনস্টিটিউট অফ আমেরিকা (CIA) তে প্রায় ৭০-৮০% শিক্ষার্থী নারী। দেশের চার-পাঁচ তারকা হোটেল বা বিদেশে শেফ হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আমাদের দেশে শেফ পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
শেফ হিসেবে মেয়েরা কেন আসবেন?
একজন শেফ হতে চাওয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রান্নার প্রতি ভালোবাসা। যদি আপনি রান্নাকে পেশা হিসেবে নিতে চান, তাহলে আপনার প্রতিদিনের রান্না একটি অনন্য শিল্পে পরিণত হবে। আপনি নতুন নতুন ডিশ তৈরি করবেন, আর সেই ডিশ যখন মানুষের প্রশংসা পাবে, তখন আপনিও বুঝতে পারবেন, আপনার কাজ কতটা অর্থপূর্ণ।
এই পেশায় আগ্রহী হলে আপনি অনেক কিছু শিখবেন এবং এর মাধ্যমে নিজেকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বীও করতে পারবেন। ভবিষ্যতে খাদ্য শিল্পে আপনার মেধা এবং দক্ষতা আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হবেন।
তবে, বাংলাদেশের রান্নার শিল্পেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসছে। কিছু মেয়েরাই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন শেফ হিসেবে, এবং তারা এখন বিশ্বব্যাপী পরিচিত। কয়েকটি বিখ্যাত নামের মধ্যে রয়েছে:
- Clare Smyth – লন্ডনের "Core" রেস্টুরেন্টের হেড শেফ, যিনি মিসিলিন স্টার পেয়েছেন।
- Anne-Sophie Pic – ফ্রান্সের এক তারকা মিসিলিন শেফ এবং তার নিজস্ব রেস্টুরেন্টের কর্ণধার।
- Monica Galetti – নিউজিল্যান্ডে জন্ম নেওয়া মাস্টার শেফ বিচারক।
- Garima Arora – প্রথম ভারতীয় মহিলা শেফ যিনি মিসিলিন স্টার অর্জন করেছেন।
শেফ পেশায় আগ্রহী হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ:
শেফ পেশায় আসার জন্য প্রথমে আপনাকে কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে হবে। আপনার জানা উচিত, আজকাল রান্নার শিল্প অনেক দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য নানা সুযোগ রয়েছে। তবে, নিজেকে এই শিল্পে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সঠিক প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা অর্জন অপরিহার্য। আপনি শেফ হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন দেশের বা বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।
বাংলাদেশে ৩ মাসের একটি সার্টিফিকেট কোর্সের খরচ প্রায় ৩০-৫০ হাজার টাকা, আর এক বছরের ডিপ্লোমা কোর্সের খরচ ১ থেকে ১.৫ লাখ টাকা। তবে বিদেশে যেমন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা আরও অন্যান্য দেশে কালিনারি কোর্সের খরচ ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা হতে পারে। যদি আপনি আরও উন্নত প্রশিক্ষণ চান, তাহলে ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, বা আমেরিকার মতো দেশে খরচ অনেক বেশি হতে পারে।
শেফ পেশায় কি চ্যালেঞ্জ রয়েছে?
শেফ পেশায় এসে মহিলাদের প্রথম যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় তা হলো সামাজিক বাধা। অনেকেই এখনও রান্নার কাজকে 'মেয়েলি কাজ' হিসেবে দেখেন এবং এই পেশাকে ক্যারিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে তাদের সংকোচ হয়। কিন্তু শেফ পেশায় আসার আগে, প্রথমত আপনাকে নিজের মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে আপনি যে কাজ করবেন সেটিকে ভালোবাসতে হবে। ধৈর্য এবং একাগ্রতা দিয়ে আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে।
একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, রান্নার শিল্প শুধু খাবারের তৈরি নয়, এটি একটি সৃজনশীল কাজ। এ পেশায় প্রতিদিনই নতুন কিছু তৈরি করতে হবে এবং প্রতিটি প্লেটে নতুন কিছু ভিন্নতা আনতে হবে। আপনি যদি শেফ হিসেবে সফল হতে চান, তবে প্রতিনিয়ত নিজের দক্ষতা এবং সৃজনশীলতা নিয়ে কাজ করতে হবে।
শেফ হিসেবে চাকরির বাজার:
বিশ্বব্যাপী শেফের চাহিদা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। দেশে বা বিদেশে যে কোনো ভালো রেস্টুরেন্টে শেফদের প্রয়োজন। শেফ পেশায় কেবল একটি ৫ তারকা হোটেল বা রেস্টুরেন্টের কর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগই নয়, আপনি নিজেও ক্যাটারিং, ফুড ব্লগিং বা শেফ প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতে পারেন। আপনার হাতে অনেক সুযোগ রয়েছে যা আপনি সঠিক পরিকল্পনা এবং দক্ষতার মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারেন।
উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ:
রান্নার শিল্পে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য আরো অনেক সুযোগ রয়েছে। যেমন, আপনি যদি হাইজিন এবং পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাহলে খাবারের মান এবং স্বাস্থ্যবিধি ভালো রাখার মাধ্যমে ব্যবসা সফল করতে পারবেন। আজকাল অনেক রেস্টুরেন্ট স্বাস্থ্য সচেতন খাবার তৈরি করে ব্যবসা বাড়াচ্ছে।
শেফ হতে চাওয়ার পথ একেবারেই বন্ধ নয়। যদি আপনি রান্নাকে ভালোবাসেন এবং শেফ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চান, তবে আপনার জন্য অসংখ্য সুযোগ অপেক্ষা করছে। শুধু প্রয়োজন সঠিক প্রশিক্ষণ, পেশাদারি মনোভাব এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে আপনাকে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে হবে।
শেফ পেশা: বর্তমানে নারী ও পুরুষের কাছে একটি জনপ্রিয় এবং চাহিদা সম্পন্ন পেশা
বর্তমানে, শেফ পেশা শুধু একজন রান্নার বিশেষজ্ঞ হওয়ার বাইরেও একটি বৃহৎ পেশাগত সুযোগ হিসেবে গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে ট্যুরিজম ও হোটেল শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই পেশা অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। একটি দেশে পর্যটকদের আগমন, নতুন হোটেল বা রেস্টুরেন্টের উদ্বোধন, খাবারের গুণমান এবং পরিবেশনা সবকিছুই শেফের দক্ষতার উপর নির্ভরশীল। শেফ পেশা আজকাল এমন একটি ক্যারিয়ার হয়ে উঠেছে যা শুধু চাকরি হিসেবে নয়, উদ্যোক্তা হওয়ারও অনেক সুযোগ এনে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক শেফ পেশা: বিশাল বাজার এবং চাহিদা
বিশ্বব্যাপী, শেফদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ দিন দিন বেড়ে চলেছে। আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় ১,৫০,০০,০০০ এর বেশি রেস্টুরেন্ট রয়েছে যেখানে ৩০,০০,০০০ এরও বেশি শেফ এবং রান্নার পেশাদাররা কর্মরত। শেফদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, রেস্টুরেন্ট, এবং ক্যাটারিং সেবার অংশ হিসেবে কাজ করছেন। শেফদের পেশাগত দক্ষতা, সৃজনশীলতা, এবং রান্নার প্রতি ভালোবাসা এই শিল্পের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশের শেফ পেশার সম্ভাবনা
বাংলাদেশেও শেফ পেশার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। ২০২০ সালে ১২টি নতুন হোটেল ও রেস্টুরেন্ট বাংলাদেশের ট্যুরিজম এবং হোটেল সেক্টরে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে। এসব হোটেল ও রেস্টুরেন্টের জন্য প্রয়োজন প্রায় ২০০০ শেফের। এই সংখ্যাটি শুধুমাত্র হোটেল বা রেস্টুরেন্টের চাকরির সুযোগই নয়, এই পেশায় উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক সম্ভাবনা তৈরি করছে। দেশীয় পর্যায়ে ফুড অ্যান্ড হসপিটালিটি শিল্পের বিকাশের জন্য শেফদের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।
শেফ পেশায় চাকরি ও উদ্যোগের সুযোগ
শেফ পেশা বর্তমানে শুধুমাত্র একটি চাকরি হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি ব্যাপক সুযোগপূর্ণ পেশা, যেখানে ব্যক্তি নিজস্ব উদ্যোগ নিয়েও সফল হতে পারে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে:
রান্নার বই বা রেসিপি বই লেখা
আপনি যদি রান্নার প্রতি ভালোবাসা এবং দক্ষতা রাখেন, তবে রান্নার বই বা রেসিপি বই লেখা একটি দারুণ উদ্যোগ হতে পারে। অনেক শেফ ইতিমধ্যে তাদের নিজস্ব রান্নার বই প্রকাশ করে সুনাম অর্জন করেছেন এবং তাদের কাজের মাধ্যমে বিশাল পরিমাণ আয় করেছেন।ক্যাটারিং ব্যবসা
ক্যাটারিং একটি চাহিদাপূর্ণ ব্যবসা। বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠান, কর্পোরেট ইভেন্ট এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানগুলিতে শেফদের ক্যাটারিং সেবা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যদি আপনি পেশাদার ক্যাটারিং ব্যবসায় নামতে চান, তবে এটি একটি লাভজনক উদ্যোগ হতে পারে।রান্নার পরামর্শক হিসেবে চাকরি
বর্তমানে অনেক হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং খাবার সংস্থা রান্নার পরামর্শক নিয়োগ দিতে আগ্রহী। শেফ হিসেবে যদি আপনার অভিজ্ঞতা থাকে, তবে আপনি খাদ্য প্রস্তুতি, মেনু ডিজাইন, অথবা হোটেল ও রেস্টুরেন্ট ব্যবস্থাপনায় পরামর্শ দিতে পারেন।নিজস্ব রেস্টুরেন্ট চালানো
একটি রেস্টুরেন্ট চালানো বর্তমান সময়ে একটি সফল ব্যবসা হতে পারে, বিশেষ করে যদি আপনি ভিন্ন ধরনের খাবার বা নির্দিষ্ট কোনো খাদ্যশৈলী উপস্থাপন করেন। এটি শুধু লাভজনক নয়, বরং আপনার সৃজনশীলতা প্রকাশেরও একটি সুযোগ।শেয়ার রেস্টুরেন্ট ব্যবসা
আপনি যদি নিজে রেস্টুরেন্ট খুলতে চান, কিন্তু বড় ধরণের ইনভেস্টমেন্ট করতে সক্ষম না হন, তবে শেয়ার রেস্টুরেন্ট ব্যবসা একটি বিকল্প হতে পারে। আপনি অন্য উদ্যোক্তাদের সাথে পার্টনারশিপ করে একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করতে পারেন।হোম ডেলিভারি ব্যবসা
আজকাল অনেক শেফ ঘরে বসে রান্না করে হোম ডেলিভারি দিয়ে ব্যবসা শুরু করছেন। বিভিন্ন ধরনের খাবারের হোম ডেলিভারি বিশেষ করে ব্যস্ত শহরগুলিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এটি খুবই লাভজনক হতে পারে যদি আপনি জনপ্রিয় এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি মনোযোগ দেন।
শেফ পেশার ভবিষ্যত: কেন এটি একটি চাহিদা সম্পন্ন পেশা?
শেফ পেশা বর্তমানে একটি চাহিদা সম্পন্ন পেশা হয়ে উঠেছে। আমাদের সমাজে খাবারের প্রতি আগ্রহ এবং খাদ্য সংস্কৃতির প্রতি মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি, বাংলাদেশে ট্যুরিজম ও হোটেল সেক্টরের উন্নতির সাথে সাথে রেস্টুরেন্ট এবং ফুড বিজনেসেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে। একদিকে যেমন শেফরা নতুন নতুন খাবার তৈরি করে গর্বিত হচ্ছেন, তেমনি তারা তাদের সৃজনশীলতা এবং দক্ষতা দিয়ে দেশের খাবারের বাজারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন।
এছাড়া, বর্তমান সময়ে, খাবারের প্রতি মানুষের রুচির পরিবর্তন, এবং পুষ্টি সচেতনতার ফলে শেফদের কাজের পরিধি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। একসময় যে খাবারের উপাদান এবং পদ্ধতি ছিল সাধারণ, তা এখন বিশেষজ্ঞ শেফদের হাত দিয়ে অত্যাধুনিক এবং স্বাস্থ্যসম্মত পদে রূপান্তরিত হচ্ছে।
আপনি যদি শেফ হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তবে আপনার প্রতিটি পদক্ষেপে একাগ্রতা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা এবং ভালোবাসা থাকা উচিত। এই পেশায় সফল হতে হলে আপনার নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে এবং কখনো হতাশ হতে হবে না। একদিন আপনি পৃথিবীজুড়ে পরিচিত একজন শেফ হতে পারবেন—বিশ্বের কোনো এক রেস্টুরেন্টে আপনার নাম লেখা থাকবে, এবং আপনি আপনার দেশের মানুষকে গর্বিত করবেন।